বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক চুক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের (ডিলমেকার) একটি অংশ ভেবেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ প্রবেশ বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। কিন্তু প্রত্যাশিত ‘ট্রাম্প বাম্পের’ দেখা না পেয়ে কেউ কেউ অর্থনৈতিক উত্থানের পূর্বাভাস পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ শেয়ারবাজারের পতন ও নিয়ন্ত্রক নীতির অনিশ্চয়তা অধিগ্রহণ চুক্তি ও প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) পিছিয়ে দিচ্ছে। ডাটা পরিষেবা সংস্থা ডিলজিকের তথ্য অনুসারে, বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) এ পর্যন্ত ঘোষিত একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) চুক্তির সংখ্যা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। খবর এফটি।
প্রায় তিন মাসে ৬ হাজার ৬০০টির মতো বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ চুক্তির ঘোষণা এসেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। এছাড়া ২০২১ সালের শীর্ষ সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম।
ওয়াল স্ট্রিট দুই বছর ধরে চুক্তির ধারা পুনরুজ্জীবনে চেষ্টা করছে। মহামারীকালে চুক্তির জোয়ার দেখা গেলেও সুদহার বাড়ায় ২০২২ সালে এর পতন ঘটে। আশা করা হয়েছিল, ২০২৩ সালে ব্যবসায়িক চুক্তির বাজার পুনরুদ্ধার হবে। ২০২৪ সালের শুরুতে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও খুব শক্তিশালী হয়নি। চলতি বছর ট্রাম্পের বিজয়ের পর বিনিয়োগ আস্থা কিছুটা বাড়লেও প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর দফায় দফায় আমদানি শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দেন এবং নতুন নিয়ন্ত্রক নীতি গ্রহণ করেন, যা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এর ফলে অধিগ্রহণ তো দূরের কথা, কোম্পানিগুলো পরবর্তী কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনাই করতে পারছে না। এমন উদ্বেগের মাঝে চাপে রয়েছে মার্কিন শেয়ারবাজার। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ শতাংশ পতন দেখেছে।
নিয়ন্ত্রক নীতিজনিত অনিশ্চয়তার বড় উদাহরণ ডাইভারসিটি, ইকুইটি ও ইনক্লুশন (ডিইআই)। সম্প্রতি ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান সতর্ক করেছেন, ডিইআই নীতি অনুসরণ করা কোম্পানিকে চুক্তির অনুমতি দেয়া হবে না। আবার অ্যান্টিট্রাস্ট (একচেটিয়াবিরোধী) নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ হতে পারে, যদিও ধারণা করা হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে শিথিল হবে।
এমঅ্যান্ডএ বিষয়ে পরামর্শদাতা সিম্পসন থ্যাচারের প্রধান জনাথন কোরসিকো বলেন, ‘নতুন প্রশাসন এলে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকেই। কিন্তু সাম্প্রতিক এ অনিশ্চয়তা আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি।’
অবশ্য ডিলজিকের তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত অধিগ্রহণ চুক্তির মোট মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যার প্রধান কারণ কয়েকটি বিশাল চুক্তি। মার্চে গুগলের প্যারেন্ট অ্যালফাবেট নিজেদের ইতিহাসের বৃহত্তম অধিগ্রহণ ঘোষণা করেছে। ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারে তারা কিনে নিচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ। অন্যদিকে ব্ল্যাকরক ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পানামা খালের দুটিসহ একাধিক বন্দর কিনেছে। এগুলোর মালিক হংকংভিত্তিক সিকে হাচিসন অনেকটাই রাজনৈতিক চাপে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
চুক্তি বাড়ার পেছনে আরেকটি কারণ প্রাইভেট ইকুইটি (পিই) কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের নগদ অর্থ ফেরত দেয়ার চাপে রয়েছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় হওয়া অধিগ্রহণের মোট মূল্য ২৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৬ হাজার কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে দুই বছর ধরে নিম্ন স্তরে থাকা অধিগ্রহণ বাজারে প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধার পুরোপুরি আসেনি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান এভারকোরের মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংকিং বিভাগের কো-হেড নবীন নটরাজ বলেন, ‘এমঅ্যান্ডএর বাজার পুনরুদ্ধারে এ বিলম্ব বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপ্রত্যাশিত নয়। তবে সামনে গতি আসতে পারে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও বৈদেশিক নীতিগত অনিশ্চয়তা যদি দূর হয়।’
বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যাংকার ও আইনজীবী জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিগ্রহণের আলোচনা চলছে। তবে চূড়ান্ত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সিইও ও পরিচালনা পর্ষদ অনেক সতর্ক। আইনি সংস্থা ফ্রেশফিল্ডসের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের অংশীদার পিয়ার্স প্রিচার্ড জোন্স বলেন, ‘চুক্তির বিষয়ে অনেক বেশি আগ্রহ থাকলেও কার্যকর করার মনোভাব দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে দেখলে আমি বাজি ধরতে চাই না।’
কিছু কোম্পানি বাজারে আসার পরিকল্পনা করলেও আইপিও বাজার প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধার অর্জন করতে পারেনি। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ বলছে, এখন পর্যন্ত আইপিও থেকে প্রাপ্ত আয় গত বছরের তুলনায় মাত্র ২০ শতাংশ বেশি, যা ২০২১ ও ২০২২ সালের তুলনায় অনেক কম।
বাজারের দুর্বল পরিস্থিতির কারণে কিছু ব্যাংক ও আইনি সংস্থা তাদের নিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্লাটফর্মের সহপ্রতিষ্ঠাতা উইল লাহাইস বলেন, ‘ব্যাংকগুলো এখনো সেরা কর্মী নিয়োগ দিতে চায়। তবে প্রথম প্রান্তিকের শেষের দিকে এসে অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, নিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতা স্থিতিশীল হচ্ছে, বছরের শুরুতে যে দ্রুতগতি ছিল তা এখন কমে আসছে।’
গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো প্রতিষ্ঠানে চুক্তি কার্যক্রম এখন কম। তাই জুনিয়র ব্যাংকাররা চাকরি ছেড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন লোক নিয়োগ নাও করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাজারের অস্থিরতা ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে দরকষাকষিতে সমস্যা তৈরি করছে। তবে অনেক পরামর্শক বলছেন, অ্যান্টিট্রাস্ট-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমলে কিছু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।